First Day Experiences Of Cadet
Rezaur Rahman, 13/777 (Reza)


কলেজে বসে লেখা দিনলিপি সব হারিয়ে ফেলেছি কিন্তু বন্ধুরা বলছে আমরা ৮ ই আগস্ট ১৯৭৬ কলেজে পদার্পণ করেছি।



সে হিসেবে, কমলাপুর বাস ডিপো থেকে আব্বার সাথে আমি ৭ই মার্চ ভোরবেলা বিআরটিসি বাসে করে ঝিনাইদহের উদ্দেশ্যে রওনা হই।



সাদা ড্রেস দেখে আমাকে বাসেই পাকড়াও করেন কলেজে কর্মরত এক ভদ্রলোক। পরে আব্বার সাথে পরিচয় হয় এবং জানা যায় হাসপাতালে কর্মরত এই ভদ্রলোক আমাদের দেশি। তখন থেকে পরবর্তী ছয় বছর চলল আমার উপর উনার আদেশ উপদেশ বর্ষণ।



পথে কামারখালি বা মধুখালি কোন একটা জায়গায় বাসটা হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেলে আমরা আরেকটা বিআরটিসি থামিয়ে বাকি পথ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিনেদা গেলাম।



তখন সম্ভবত ঝিনেদায় কোন হোটেল ছিল না। লিখিত পরীক্ষার মতো এবারো উঠলাম আব্বার বন্ধু, ঝিনেদা পৌরসভার চেয়ারম্যান, এডভোকেট আমির হোসেন চাচার বাসায়।



পরদিন দুপরে রিকশায় 'কিন ব্রিজে'র উপর দিয়ে কলেজ যাত্রা। আমি যেহেতু আগেই কলেজে লিখিত পরীক্ষা দিয়েছি তাই এবার আব্বাকে পথ দেখিয়ে আমিই নিয়ে গেলাম।



পৌছানের পর হঠাৎ দেখি প্যারেড করতে করতে একটা দল এসে কলেজ ব্লকে হাজির। একাডেমি ব্লকে একজন আমাদের একটা ডেস্কে নিয়ে গেল। তালিকায় নাম দেখে দেখে লকার পার্টনারদের নাম বলে দেয়া হল। খুব হাসিখুশি অমায়িক এক ভাই প্রথমে আব্বা তারপর আমার সাথে পরিচিত হলেন। নাম বললেন মুনীর হাসান, আমার "লকার পার্টনার"। লকার পার্টনার জিনিসটা কি? বুঝলাম না, চুপ করে থাকলাম। উনি নিয়ে গেলেন আরেকটা ডেস্কে ওখান থেকে হাতে লেখা একটা কাগজের ব্যাজ নিয়ে আমার বুকে পরিয়ে দিলেন। "রেজাউর" ১৩/খ/৭৭৭। আব্বা বললেন, তোর ক্যাডেট নম্বরটা খুব সুন্দর, ট্রিপল সেভেন। মুনীর ভাই ত লাফ দিয়ে উঠে বললেল, বাহ্ ট্রিপল সেভেন! খুব সুন্দর ক্যাডেট নম্বর ত, তুমি খুব লাকি। এখনকার বাচ্চারা দেখি "ট্রিপল" শব্দটার সাথে ক্লাশ ওয়ান থেকে পরিচিত কিন্ত ক্লাশ সেভেনে উঠেও আমার দৌড় "ডাবল" পেরিয়ে "ট্রিপলে" উঠে নি। পরে অবশ্য জেনেছি আমার ক্যাডেট নম্বরটা ইনটেকের শেষ আট জনের একজন। অর্থাৎ যখনই জুতা-মোজা, বই-খাতা যাই দিক সব সময় লাইনের একেবারে শেষ ভাগে আমরা ক'জনা। এখনো বন্ধুরা সব কিছু ক্যাডেট নম্বর ধরে ধরে সিরিয়লি গুনে।



হঠাৎ একাডেমি ব্লকের বাইরে ব্যান্ড পার্টির আওয়াজ। আমরা বাইরে গিয়ে দাঁড়াতেই উনারা আরো উৎসাহের সাথে বাজাতে লাগলেন। ব্যান্ড মেজর সম্ভবত ছিলেন ৮ ইনটেকের আতিয়ার ভাই, লাঠি নিয়ে উনি অনেক কসরৎ দেখালেন। কলেজ ক্যাপ্টেনও মনে হয় কিছুক্ষণ উনাদের লেফট রাইট করালেন।



মুনীরভাই আমাকে আর আব্বাকে নিয়ে এবার অডিটোরিয়ামে বসলেন। ক্যাডেটরা লাইন ধরে একেবারে বাম পাশে, মাঝে লকার পার্টনার আরেক পাশে পিতামাতা।



খায়বার হাউজের রো'তে আমার ঠিক সামনে ফর্সা সুন্দর একটা ছেলে অনবরত পটরপটর করছে। নাম বলল আখতারুজ্জামান ৭৭৮। ওর বড়ভাইয়ের নাম এসএম আশিকুজ্জামান। ভাইয়ের সুত্রে আগে থেকেই কলেজের সব কিছু তার আগে থেকেই নখদর্পণে। আমার ঠিক পিছনে মিষ্টি চেহারার একটা ছেলে, নাম কবির ৭৭৩। এই প্রথম আমার চেয়ে কালো কোন ছেলে আমি দেখলাম।



কলেজ ক্যাপ্টেন ছিলেন সম্ভবত ৭ ইনটেকের মাহমুদ ভাই। উনি কিছু একটা কমান্ড করতেই আমাদের স্যুটকেস নিয়ে লকারপার্টনাররা হাউজে রেখে আসলেন।



এবার শুরু হলো মুনীর ভাইয়ের ওরিয়েন্টশন লেকচার। তাও আবার সম্পূর্ণ ইংরেজিতে। আমি ভাঙা ভাঙা ইয়েস নো ভেরি গুড, হু-হা করে সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছি। সামনে ইংরেজি কথোপকথন শুনে পিছনের ছেলেটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আগ বাড়িয়ে আমাদের কথা শুনছে, ওদিকে ওর লকার পার্টনার ওকে কি বলছে খেয়াল করছে না। পরে একদিন কবির আমাকে বলেছিল ইংরেজিতে কথা বলতে হবে শুনে সে ঘাবড়ে গিয়েছিল।



হাসিখুশী লকার পার্টনারকে এই প্রথম মনে হলো একজন আইনের ধারক বাহক। কয়েকটা আইন জারি করে দিলেন,

- কখনো মিথ্যা কথা বলা যাবে না

- সিনিয়রদের কথা শুনতে হবে, কখনো 'কেন" প্রশ্ন করা যাবে না

- সব সময়ই ইংরেজিতে কথা বলতে হবে

- সিনিয়রদেরকে নামের সাথে ভাই বলে ডাকতে হবে



বললাম, প্রথম দুইটায় সমস্যা নাই। পরবর্তী দুইটায় একটু সমস্যা আছে। প্রথমত, তিনশ লোকের নাম মেরে ফেললেও আমি মুখস্থ করতে পারব না। দ্বিতীয়তঃ যেসব শব্দের ইংরেজি জানি না সেটার কি হবে? আমার মতো একটা গবেট পেয়ে উনাকে মনে হলো খুব খুশি। সহজ সমাধান করে দিলেন। বললেন, মনে করো কোন শব্দের ইংরেজি জানো না ওটা বাংলা বললেই হবে। যেমনঃ আই নিড সিম "সূতা"।



অধ্যক্ষ লে. কর্নেল মুজিব এসে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। সম্ভবত এরপর আমরা সবাই ডাইনিং হলে গিয়ে চা-বিস্কুট খেলাম। লকার পার্টনাররা কিভাবে যেন বাবা-মার সাথে আমাদের আলাদা করে ফেললেন। হাউজের সামনে এসে দেখি আব্বা নাই। ইতোমধ্যে হঠাৎ মাঠের কোন থেকে বেলের শব্দ ভেসে আসল। সবার ভিতর হঠাৎ একটা কর্মচান্চল্যতা দেখা গেল। দোতলার রুমে নিয়ে বললেন এটার নাম ডর্মিটরি সংক্ষেপে ডর্ম। আমার ভাগে ডর্ম নাইনের পূব দিকের তৃতীয় বেড। বাকি বন্ধুদের সাথে পরিচিত হলাম। খুলনার মঞ্জুর যোয়ার্দার ৭৭২, সাতক্ষীরার মোঃ কবিরুর ইসলাম ৭৭৩ (মরহুম), আমি ৭৭৭, যশোহরের এস. এম আখতারুজ্জামান ৭৭৮, বরিশালের মুনীর আহমেন ৭৮২। ডর্ম লিডার ১১ ইনটেকের নিয়জ ভাই। বাকি সব ক্লাশ এইটের বড় ভাইয়েরা।



দ্রুত পাজামা পাঞ্জাবি পরে কলেজ মসজিদে নামাজ পড়ে আসলাম। ঐ দিন রাতে ঠিক কি হয়েছিল মনে নাই। তবে ডিনারে গিয়ে দেখলাম ফর্ক স্পুন দিয়ে খেতে হবে। আমার মামাতে ভাই মঈনুদ্দিন ছিল বদরের হাউজের ক্লাশ এইটে। ইংলিশ মিডিয়াম থেকে বাংলায় এসে ক্লাশ জাম্প করে মাঈনু উপরের ক্লাশে উঠে হয়ে গেল মাঈনুদ্দিন ভাই। মাঈনু আমাকে কাঁটা চামচ এবং কলেজর নিয়মকানুন সম্পর্কে হাল্কা কিছু টিপস আগেই দিয়ে দিয়েছিল।



ডিনারের পর হাউজ মাস্টার বাংলার গোলাম জীলানী মুর্শেদ স্যার ক্লাশ সেভেনকে হাউজ অডিটোরিয়ামে ডেকে পাঠালেন। বসার পর স্যার ম্যাডামকে নিয়ে ঢুকলেন। গল্প টল্প করে ম্যাডাম চলে গেলে মনটা আরো বিষণ্ণ হয়ে গেল।



পরদিন সকালে হাউজ টিউটররা আসলেন ডর্মে খোঁজ নিতে। বললেন রাতে কোন অসুবিধা হয়েছে কিনা? আমার বন্ধু মুনীর বলে উঠল- স্যার, রাতে লাইটস-অফের পর শিয়ালের কান্নার শব্দে ভয় পেয়ে আমরা একসাথে ঘুমিয়েছি। শুনে স্যাররা আঁতকে উঠে বললেন, না না! রাতে কেউ কারো বেডে যাবে না।